দুর্গাপূজায় DJ নিষিদ্ধ নয়, শব্দ নিয়ন্ত্রণই কি হতে পারে সমাধান?

 

দুর্গাপূজায় DJ নিষিদ্ধ নয়, শব্দ নিয়ন্ত্রণই কি হতে পারে সমাধান?

উৎসবের আনন্দ, মানুষের জীবিকা ও শব্দদূষণ—তিনটির মধ্যে ভারসাম্য কি সম্ভব?

দুর্গাপূজা বাঙালির অন্যতম বৃহৎ উৎসব। পুজোর আনন্দ, শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে বহু জায়গায় সাউন্ড সিস্টেম ও DJ-ও যুক্ত থাকে। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে DJ ও সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দেওয়া, পরিচালনা করা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশার বহু মানুষের জীবিকা।

কিন্তু অন্যদিকে অতিরিক্ত শব্দ ও উচ্চমাত্রার বেস সাধারণ মানুষের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং শব্দে সংবেদনশীল মানুষদের উপর অতিরিক্ত শব্দের বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। একইভাবে গৃহপালিত ও অবলা প্রাণী এবং পাখিরাও তীব্র শব্দে আতঙ্কিত ও অস্থির হয়ে পড়তে পারে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সমাধান কি সম্পূর্ণ DJ নিষিদ্ধ করা, নাকি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে DJ ও সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের সুযোগ রেখে কঠোরভাবে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা?

আইনেও শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে

কেন্দ্রীয় সরকারের Noise Pollution (Regulation and Control) Rules, 2000 অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকার জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশগত শব্দসীমা রয়েছে। যেমন আবাসিক এলাকায় দিনের সময়সীমায় ৫৫ dB(A) Leq এবং রাতে ৪৫ dB(A) Leq নির্ধারিত; বাণিজ্যিক এলাকায় তা ৬৫ ও ৫৫ dB(A), আর Silence Zone-এ ৫০ ও ৪০ dB(A)। নিয়ম অনুযায়ী দিন বলতে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা এবং রাত বলতে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা বোঝানো হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রকাশিত নির্দেশনাতেও খোলা জায়গায় লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতির কথা বলা হয়েছে এবং শব্দের অনুমোদিত মাত্রা বজায় রাখার পাশাপাশি amplifier-এর সঙ্গে sound limiter ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু “DJ থাকবে কি থাকবে না”—এমন সরল প্রশ্ন নয়। কতটা শব্দ হবে, কোথায় হবে, কখন হবে এবং শব্দের মাত্রা কে নিয়ন্ত্রণ করবে—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

DJ ব্যবসায়ীদের কথাও কি ভাবা উচিত?

একজন DJ বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবসায়ীর কাছে দুর্গাপূজা বছরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসার সময়। তাঁদের অনেকের কাছে এই কয়েকদিনের আয় পরিবারের সারা বছরের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা হলে তাঁদের ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের শান্তি ও স্বাস্থ্যের অধিকারও উপেক্ষা করা যায় না।

এই দুই দিকের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে—DJ সম্পূর্ণ বন্ধ না করে নির্দিষ্ট শব্দসীমা, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট স্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে?

১. Sound limiter বাধ্যতামূলক করা—নির্ধারিত সীমার বেশি শব্দ যাতে না ওঠে।

২. dB meter দিয়ে নিয়মিত শব্দমাত্রা মাপা—শুধু কাগজে নিয়ম না রেখে বাস্তবে কত শব্দ হচ্ছে তা পরিমাপ করা।

৩. অতিরিক্ত Bass নিয়ন্ত্রণ—শুধু মোট dB নয়, অত্যধিক নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির কম্পনও মানুষের ঘরবাড়ি ও আশপাশে বিরক্তির কারণ হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে Bass/Subwoofer-এর মাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

৪. আবাসিক ও হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ—হাসপাতাল, নার্সিংহোম, বৃদ্ধাশ্রম, স্কুল এবং নির্দিষ্ট Silence Zone-এর আশপাশে আরও কঠোর নিয়ম থাকা উচিত।

৫. সময় মেনে DJ বাজানো—আইন ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদিত সময়সীমার বাইরে শব্দ না করা। Noise Rules-এ সাধারণভাবে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত লাউডস্পিকার ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে; নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার সীমিত ছাড় দিতে পারে।

৬. শব্দের দিক নিয়ন্ত্রণ করা—লাউডস্পিকার এমনভাবে বসানো যেতে পারে যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আবাসিক এলাকার দিকে শব্দ ছড়িয়ে না পড়ে।

৭. নিয়ম ভাঙলে জরিমানা ও যন্ত্র বাজেয়াপ্তের ব্যবস্থা—যাতে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা সাউন্ড ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং মাত্রাতিরিক্ত শব্দ করা বন্ধ হয়।

মানুষের অধিকার বনাম ব্যবসায়ীদের অধিকার—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ

শব্দদূষণ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টও একাধিক মামলায় মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অধিকার এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে আদালতের নথিতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ছাড়ের ব্যবস্থার কথাও রয়েছে।

তাই বিষয়টিকে “DJ চাই” বনাম “DJ চাই না”—এই দুই মেরুতে না দেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতির দিকে তাকানো যেতে পারে।

দুর্গাপূজার আনন্দ থাকবে, DJ ব্যবসায়ীদেরও কাজ থাকবে, কিন্তু সেই আনন্দ যেন অন্য একজন অসুস্থ মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে না নেয়; কোনও বৃদ্ধ বা গর্ভবতী মহিলাকে অস্বস্তিতে না ফেলে; কোনও শিশুকে আতঙ্কিত না করে এবং প্রাণী-পাখিদের অযথা ভয় ও অস্থিরতার কারণ না হয়—এটাই হতে পারে দায়িত্বশীল উৎসবের লক্ষ্য।

তাহলে প্রশ্ন থাকল—

আসন্ন দুর্গাপূজায় DJ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে, নির্দিষ্ট dB সীমা, Bass/Frequency নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট সময়, Sound Limiter ও নিয়মিত শব্দমাত্রা পরিমাপের মাধ্যমে কি একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়?

DJ ও সাউন্ড ব্যবসায়ীদের জীবিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, শান্তি ও স্বস্তিও গুরুত্বপূর্ণ।

আপনাদের কী মত?
DJ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত, নাকি নিয়ম মেনে সীমিত শব্দে DJ চালানোর সুযোগ দেওয়া উচিত?

আপনার মতামত জানান।

        Bengal TIMES News

       খবরের সাথে মানুষের পাশে 🇮🇳


Comments

Popular posts from this blog

লালপথে তেরঙ্গা, বাংলার উন্নয়নের অঙ্গীকার—৮০তম স্বাধীনতা দিবসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একাধিক কর্মসূচি

২০ বিদ্রোহী TMC সাংসদকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিস

📰 দিনের শেষে বাছাই দশ