২০ বিদ্রোহী TMC সাংসদকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিস
২০ বিদ্রোহী TMC সাংসদকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিস
NCPI-তে যোগদান ও দলত্যাগ মামলায় বড় আইনি লড়াই, নজরে স্পিকার
নয়াদিল্লি, ২৫ আগস্ট ২০২৬: তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি ঘিরে বড় আইনি মোড়। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও লোকসভায় দলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনের ভিত্তিতে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদকে নোটিস জারি করেছে।
তবে এখনই তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হয়ে যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট মূলত জানতে চেয়েছে, অযোগ্য ঘোষণার দাবিতে চলা প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট সাংসদদের বক্তব্য কী। মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা কত দ্রুত এই অযোগ্যতার আবেদনগুলির নিষ্পত্তি করবেন।
কীভাবে শুরু হল বিতর্ক?
২০২৬ সালের জুন মাসে তৃণমূলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ নিজেদের দল থেকে আলাদা হয়ে Nationalist Citizens Party of India (NCPI)-এর সঙ্গে একীভূত হওয়ার দাবি করেন। তাঁদের দাবি, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সাংসদ একসঙ্গে থাকায় সংবিধানের দশম তফসিলের ‘merger’ বিধান তাঁদের সুরক্ষা দেয়।
এরপর লোকসভায় তাঁদের পৃথকভাবে বসার অনুমতিও দেওয়া হয় এবং তাঁরা NCPI গোষ্ঠী হিসেবে সংসদীয় কার্যকলাপে অংশ নিতে শুরু করেন।
তৃণমূলের পাল্টা যুক্তি—এই সাংসদরা তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া বা দলীয় সদস্যপদ কার্যত পরিত্যাগ করা হলে তা দলত্যাগ-বিরোধী আইনের আওতায় অযোগ্যতার কারণ হতে পারে।
২০ জন সাংসদ কারা?
সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা আবেদনে যে ২০ জনের নাম রয়েছে তাঁরা হলেন—
- কাকলি ঘোষ দস্তিদার
- সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
- শতাব্দী রায়
- প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়
- রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়
- জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া
- পার্থ ভৌমিক
- অরূপ চক্রবর্তী
- দীপক দেব অধিকারী
- সায়নী ঘোষ
- বাপি হালদার
- মহম্মদ আবু তাহের খান
- কালিপদ সরেন খেরওয়াল
- অসিত কুমার মাল
- জুন মালিয়া
- মিতালি বাগ
- খলিলুর রহমান
- মালা রায়
- শর্মিলা সরকার
- ইউসুফ পাঠান।
সুপ্রিম কোর্টে আজ কী হল?
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত-এর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মামলাটি ওঠে। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনা।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদনের মূল বক্তব্য ছিল—স্পিকারের কাছে অযোগ্য ঘোষণার আবেদনগুলি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে, তাই দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সুপ্রিম কোর্ট স্পিকারের দপ্তরকে নতুন করে নোটিস দেয়নি। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, স্পিকার ইতিমধ্যেই ২০ জন সাংসদকে অযোগ্যতার আবেদনের বিষয়ে নোটিস দিয়েছেন এবং তিনি স্পিকারের পক্ষে আদালতে উপস্থিত থাকবেন। এরপর আদালত ২০ সাংসদকে নোটিস জারি করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন
এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংবিধানের দশম তফসিল, অর্থাৎ Anti-Defection Law।
সাধারণভাবে কোনও সাংসদ নিজের রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করলে বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দলের নির্দেশের বিরুদ্ধে ভোট দিলে অযোগ্যতার প্রশ্ন উঠতে পারে।
কিন্তু দশম তফসিলের Paragraph 4-এ রাজনৈতিক দলের merger-এর ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। বিদ্রোহী সাংসদদের দাবি, তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হওয়ায় NCPI-র সঙ্গে তাঁদের merger বৈধ এবং তাঁরা অযোগ্য নন।
অন্যদিকে তৃণমূলের বক্তব্য, শুধু সাংসদদের একটি গোষ্ঠী অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হলেই merger বৈধ হয়ে যায় না—এই প্রশ্নেরও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
তাহলে এখন কী হতে পারে?
এখনই ২০ জন সাংসদের পদ বাতিল হচ্ছে না। প্রথমে তাঁদের বক্তব্য, তৃণমূলের অভিযোগ এবং merger-এর বৈধতা নিয়ে প্রক্রিয়া এগোবে।
এরপর মূল সিদ্ধান্তের জায়গা হবে লোকসভার স্পিকার। স্পিকার যদি তাঁদের অযোগ্য ঘোষণা করেন, তাহলে তাঁদের সাংসদ পদ চলে যেতে পারে। আর যদি merger-কে বৈধ বলে গ্রহণ করা হয়, তাহলে তাঁরা সাংসদ হিসেবে বহাল থাকতে পারেন।
অর্থাৎ, আজকের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে ‘২০ সাংসদের পদ খারিজ’ বলা ভুল হবে। বরং বলা যায়—মামলাটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যায়ে ঢুকল এবং ২০ বিদ্রোহী সাংসদকে তাঁদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রভাব কতটা?
বর্তমানে তৃণমূলের লোকসভায় মোট ২৯ জন সাংসদ ছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জন আলাদা হয়ে গেলে দলের সংসদীয় শক্তিতে বড় ধাক্কা লাগে। অন্যদিকে ওই ২০ জন NCPI-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে NDA-কে সমর্থন করছেন।
ফলে এই মামলা শুধু তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিবাদ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে লোকসভায় NDA-র সংখ্যাগরিষ্ঠতা, দলবদল-বিরোধী আইনের ভবিষ্যৎ ব্যাখ্যা এবং সংসদে রাজনৈতিক দলের ভাঙন ও merger-এর নিয়মের ওপরও।
Bengal TIMES News-এর বিশ্লেষণ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ‘২০ জনের পদ যাবে কি না’ নয়—বরং তাঁদের NCPI-তে যোগদানকে সংবিধানের দশম তফসিলের বৈধ merger হিসেবে গ্রহণ করা হবে কি না।
যদি merger বৈধ বলে স্বীকৃতি পায়, তাহলে বিপুল সংখ্যক সাংসদ একসঙ্গে দল বদল করেও অযোগ্যতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি হতে পারে।
আর যদি merger অবৈধ বলে বিবেচিত হয়, তাহলে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের অধীনে ২০ জন সাংসদের ভবিষ্যৎ বড় প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তাই আজকের সুপ্রিম কোর্টের নোটিসকে এই রাজনৈতিক-সাংবিধানিক লড়াইয়ের ‘চূড়ান্ত রায়’ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা উচিত।
Bengal TIMES News
সত্যের পক্ষে, খবরের সঙ্গে

Comments
Post a Comment